আপনি জানেন কি? বাংলাদেশে প্রতি ৩ জনে ১ জন নারী হাইপোথাইরয়েডিজমে (থাইরয়েড সমস্যা বা হরমন সমস্যা) ভুগছে। হ্যাঁ ঠিক শুনেছেন। আপনার পরিবারের কোন সদস্যের যদি থাইরয়েড বা হরমন সমস্যা সনাক্ত হয়ে থাকে তা হলে আপনি আরো বেশি ঝুকির মধ্যে আছেন। তাই, অবহেলা না করে, আপনার বাসার কোন নারী সদস্যের বয়স ২০ বছর অতিক্রম করার সাথে সাথে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ করে THS ও Free T4 (রক্ত পরীক্ষা) টেস্ট দুটো করলে আপনি বুঝতে পারবেন তিনি থাইরয়েড বা হরমন সমস্যায় ভুগছেন কি না বা তার কতটুকু ঝুকি আছে।
আজকে আমরা হাইপোথাইরয়েডিজমের লক্ষণ এবং চিকিৎসা সম্পর্কে একটা পূর্ণাঙ্গ ধারণা দেয়ার চেষ্টা করবো।
হাইপোথাইরয়েডিজম (থাইরয়েড সমস্যা বা হরমন সমস্যা) কি?
থাইরয়েড গ্রন্থি, যা আমাদের গলার সামনের দিকে প্রজাপতি আকৃতির একটি অন্তঃক্ষরা গ্রন্থি হিসেবে অবস্থান করে, শরীরের গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় একটি অপরিহার্য ভূমিকা পালন করে। এই গ্রন্থি থেকে নিঃসৃত থাইরোক্সিন হরমোন শরীরের বিপাকক্রিয়া, হৃদপিন্ডের কার্যকারিতা, হজম প্রক্রিয়া, প্রজননসহ শরীরের প্রায় প্রতিটি কোষ ও অঙ্গের কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে।
থাইরয়েড হরমোনের পরিমাণ যদি শরীরে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি বা কম হয়, তবে শরীরের স্বাভাবিক কার্যক্রমে প্রভাব পড়ে এবং বিভিন্ন শারীরিক সমস্যা দেখা দিতে পারে। যখন থাইরোক্সিন হরমোনের নিঃসরণ কমে যায়, তখন তাকে হাইপোথাইরয়েডিজম ( সাধারন ভাবে, থাইরয়েড সমস্যা বা হরমন সমস্যা) বলা হয়।
বাংলাদেশ এন্ডোক্রাইন সোসাইটির তথ্যমতে, দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৩০% (অর্থাৎ প্রায় ৫ কোটির বেশি) মানুষ কোনো না কোনোভাবে এই রোগে আক্রান্ত। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, নারীদের মধ্যে এই রোগের প্রকোপ পুরুষদের তুলনায় অনেক বেশি। পুরুষদের মধ্যে এই রোগের প্রাদুর্ভাবের হার নারীদের তুলনায় ২ থেকে ১০ গুণ কম।
এটি বোঝায় যে থাইরয়েড গ্রন্থিজনিত সমস্যাগুলোকে আমাদের দেশে যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে দেখা দরকার। সঠিক সময়ে সঠিক চিকিৎসা নিশ্চিত করা না হলে, এর প্রভাব পুরো শরীরে দীর্ঘমেয়াদী সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে।
হাইপোথাইরয়েডিজম বা থাইরয়েড সমস্যা কেন হয়?
থাইরয়েড সমস্যার পেছনে বিভিন্ন কারণ থাকতে পারে, যার মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো আয়োডিনের অভাব। থাইরয়েড গ্রন্থি থেকে থাইরোক্সিন হরমোন উৎপাদনের জন্য আয়োডিন একটি অপরিহার্য উপাদান। শরীরে আয়োডিনের পর্যাপ্ত পরিমাণ না থাকলে, থাইরয়েড হরমোনের উৎপাদন কমে যায়, যা হাইপোথাইরয়েডিজমের দিকে নিয়ে যেতে পারে। বিশেষ করে যেসব অঞ্চলে মাটিতে এবং খাবারে আয়োডিনের ঘাটতি রয়েছে, সেসব অঞ্চলের মানুষদের মধ্যে এই সমস্যা বেশি দেখা যায়। আয়োডিনের অভাব জনিত এই সমস্যাকে প্রতিরোধ করতে খাবারে আয়োডিন সমৃদ্ধ লবণ ব্যবহার করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
আয়োডিনের অভাব ছাড়াও, থাইরয়েড গ্রন্থির ইনফ্ল্যামেশন বা প্রদাহের কারণেও থাইরয়েড সমস্যা দেখা দিতে পারে। থাইরয়েডাইটিস নামক এই প্রদাহের ফলে থাইরয়েড গ্রন্থি সঠিকভাবে কাজ করতে পারে না, যা হরমোনের ঘাটতির কারণ হতে পারে।
এছাড়াও, হাইপোথ্যালামাস বা পিটুইটারি গ্রন্থি থেকে নিঃসৃত থাইরয়েড স্টিম্যুলেটিং হরমোন (TSH) এর স্বল্পতা থাইরয়েড সমস্যার একটি আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ। এই হরমোনটি থাইরয়েড গ্রন্থিকে সক্রিয় করে রাখার জন্য প্রয়োজনীয় সংকেত প্রদান করে, যা থাইরয়েড হরমোনের উৎপাদন নিয়ন্ত্রণ করে। যদি TSH এর মাত্রা কমে যায়, তবে থাইরয়েড গ্রন্থি পর্যাপ্ত থাইরয়েড হরমোন উৎপাদন করতে ব্যর্থ হতে পারে, যা হাইপোথাইরয়েডিজমের দিকে নিয়ে যায়।
অনেক মানুষের ক্ষেত্রে থাইরয়েড সমস্যা জন্মগতভাবেও থাকতে পারে। জন্মগতভাবে থাইরয়েড গ্রন্থির আকার বা কার্যকারিতায় ত্রুটি থাকলে, থাইরয়েড হরমোনের উৎপাদন স্বাভাবিকের চেয়ে কম হতে পারে। এসব ক্ষেত্রে, শিশু জন্মের পর থেকেই থাইরয়েড হরমোনের ঘাটতিজনিত বিভিন্ন লক্ষণ প্রকাশ পায়, যা প্রাথমিকভাবে শনাক্ত ও চিকিৎসা করা জরুরি।
হাইপোথাইরয়েডিজম বা থাইরয়েড সমস্যার লক্ষণঃ
থাইরয়েড সমস্যার কারণে শরীরে বিভিন্ন ধরনের লক্ষণ দেখা দিতে পারে, যা আমাদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রাকে প্রভাবিত করে। থাইরয়েড হরমোনের ঘাটতির ফলে শরীরের বিভিন্ন কার্যক্রম সঠিকভাবে পরিচালিত হতে পারে না, যার ফলে বিভিন্ন শারীরিক এবং মানসিক সমস্যা দেখা দেয়। নিচে থাইরয়েড সমস্যার কয়েকটি সাধারণ লক্ষণ এবং তাদের বিশদ বিবরণ দেওয়া হলো:
১. অস্বাভাবিকভাবে ওজন বৃদ্ধি পায়ঃ থাইরয়েড হরমোন বিপাকক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করে। হাইপোথাইরয়েডিজমের কারণে শরীরের বিপাক হার কমে যায়, ফলে অস্বাভাবিকভাবে ওজন বৃদ্ধি পায়, এমনকি খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন না করলেও।
২. চুল পড়ে যায়ঃ থাইরয়েড হরমোনের অভাবের কারণে চুলের বৃদ্ধি প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়, ফলে চুল দুর্বল হয়ে যায় এবং সহজেই পড়ে যায়। অনেক ক্ষেত্রেই মাথার ত্বকে চুল পাতলা হয়ে যায়, যা চুলের ঘনত্ব কমিয়ে দেয়।
৩. ত্বক শুষ্ক হয়ে যায় ও চুলকানির প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়ঃ হরমোনের ঘাটতির কারণে ত্বকের আর্দ্রতা কমে যায়, ফলে ত্বক শুষ্ক হয়ে যায়। শুষ্ক ত্বকের কারণে চুলকানির প্রবণতাও বাড়ে, যা অসুবিধা সৃষ্টি করতে পারে।
৪. কোষ্ঠকাঠিন্য ও বন্ধ্যাত্বের সমস্যা হয়ঃ থাইরয়েড হরমোন হজম প্রক্রিয়ায়ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। হরমোনের অভাবে হজম প্রক্রিয়া ধীর হয়ে যায়, ফলে কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যা দেখা দেয়। এছাড়াও, হরমোনের প্রভাব প্রজনন সিস্টেমের ওপরেও পড়ে, যা বন্ধ্যাত্বের কারণ হতে পারে।
৫. অতিরিক্ত ক্লান্তি অনুভব করাঃ থাইরয়েড হরমোনের ঘাটতির ফলে শরীরের শক্তি উৎপাদন প্রক্রিয়া কমে যায়, যার ফলে সারাক্ষণ ক্লান্তি অনুভূত হয়। সাধারণ কাজগুলো করতে গেলেও অতিরিক্ত পরিশ্রম করতে হয় এবং শরীর সহজেই ক্লান্ত হয়ে পড়ে।
৬. ঠান্ডা পরিবেশে না থাকলেও সহজেই ঠান্ডা লেগে যাওয়াঃ থাইরয়েড হরমোন শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে। হরমোনের ঘাটতির কারণে শরীর পর্যাপ্ত তাপ উৎপন্ন করতে পারে না, ফলে ঠান্ডা পরিবেশে না থাকলেও সহজেই ঠান্ডা অনুভূত হয়।
৭. দীর্ঘ সময় কিছু মনে না থাকা বা স্মৃতিশক্তি হ্রাস পাওয়াঃ থাইরয়েড হরমোন মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতায় প্রভাব ফেলে। হরমোনের অভাবে মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা কমে যায়, যার ফলে স্মৃতিশক্তি হ্রাস পায় এবং দীর্ঘ সময় কোনো কিছু মনে রাখা কঠিন হয়ে যায়।
৮. ঘামের পরিমাণ কম হয়ঃ থাইরয়েড হরমোন ঘাম গ্রন্থির কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করে। হরমোনের অভাবে ঘামের পরিমাণ কমে যায়, যা শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে অসুবিধা সৃষ্টি করে।
৯. তাপের প্রতি সংবেদনশীল বোধ করাঃ তাপমাত্রা পরিবর্তনের প্রতি শরীরের সংবেদনশীলতা বাড়ে, ফলে গরম বা ঠান্ডা উভয় অবস্থাতেই অস্বস্তি অনুভব করা হয়।
১০. দৃষ্টিতে সমস্যা হওয়া বা চোখ জ্বালা করাঃ থাইরয়েড সমস্যা চোখের স্নায়ুতে প্রভাব ফেলতে পারে, যা দৃষ্টিতে সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে। এছাড়াও, চোখে জ্বালা বা অস্বস্তি অনুভূত হতে পারে।
১১. যেকোনো কাজে মনোযোগ কম আসা বা অলসতা অনুভব করাঃ শরীরে শক্তির অভাব এবং মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা কমে যাওয়ার কারণে যেকোনো কাজে মনোযোগ ধরে রাখা কঠিন হয়ে যায় এবং অলসতা বা উদাসীনতা অনুভূত হয়।
১২. মাসিক অনিয়মিত হওয়া ও অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ হওয়াঃ হরমোনের ঘাটতি নারীদের মাসিক চক্রের ওপরও প্রভাব ফেলে। মাসিক চক্র অনিয়মিত হয়ে যায় এবং কখনো কখনো অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের সমস্যাও দেখা দেয়।
থাইরয়েড সমস্যার এইসব লক্ষণগুলিকে গুরুত্ব দিয়ে দেখা এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি।
থাইরয়েড রোগ নির্ণয়
থাইরয়েড রোগ নির্ণয়ের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য পদ্ধতি হলো রক্ত পরীক্ষা। এই পরীক্ষার মাধ্যমে থাইরয়েড হরমোনের মাত্রা এবং থাইরয়েড স্টিমুলেটিং হরমোন (TSH) এর মাত্রা নির্ধারণ করা হয়। বাংলাদেশে থাইরয়েড রোগ নির্ণয়ের জন্য প্রাথমিক ভাবে তিনটি পরীক্ষা করা হয়ঃ
- TSH (Thyroid Stimulating Hormone) টেস্টঃ এই পরীক্ষা থাইরয়েড গ্রন্থির কার্যক্ষমতা নির্ধারণের প্রধান পরীক্ষা। TSH এর মাত্রা বেশি থাকলে হাইপোথাইরয়েডিজম এবং কম থাকলে হাইপারথাইরয়েডিজম নির্দেশ করে।
- Free T4 (Thyroxine) টেস্টঃ থাইরয়েড গ্রন্থি থেকে নিঃসৃত হরমোন T4 এর মাত্রা নির্ধারণ করা হয়। T4 এর মাত্রা কম থাকলে হাইপোথাইরয়েডিজম এবং বেশি থাকলে হাইপারথাইরয়েডিজম হতে পারে।
- Free T3 (Triiodothyronine) টেস্টঃ T3 হলো আরেকটি থাইরয়েড হরমোন, যা T4 থেকে তৈরি হয়। এটি মূলত হাইপারথাইরয়েডিজম নির্ধারণে বেশি ব্যবহৃত হয়।
এই পরীক্ষাগুলোর মাধ্যমে চিকিৎসকরা থাইরয়েড রোগ নির্ণয় করেন এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নির্ধারণ করেন।
হাইপোথাইরয়েডিজম বা থাইরয়েড সমস্যার চিকিৎসা
হাইপোথাইরয়েডিজমের চিকিৎসা মূলত হরমোনের অভাব পূরণ এবং শরীরের স্বাভাবিক কার্যক্রম ফিরিয়ে আনার উপর ভিত্তি করে করা হয়। এই লক্ষ্যে রোগীদের নিয়মিতভাবে লেভোথাইরক্সিন নামক এক ধরনের হরমোন প্রতিস্থাপন ট্যাবলেট গ্রহণ করতে হয়। লেভোথাইরক্সিন ট্যাবলেটটি (যেমনঃ থাইরক্স ২৫ বা থাইরক্স ৫০ বা থাইরক্স ১০০ ট্যাবলেট) মূলত থাইরয়েড হরমোনের বিকল্প হিসেবে কাজ করে, যা শরীরে হরমোনের ঘাটতি পূরণ করে এবং বিপাকক্রিয়া সহ শরীরের অন্যান্য কার্যক্রমকে নিয়ন্ত্রণে রাখে।
এই চিকিৎসা প্রক্রিয়ায় রোগীদের প্রায়শই ২-৩ মাস পর পর রক্ত পরীক্ষা করতে হয় (TSH & T4), যাতে হরমোনের স্তর পর্যবেক্ষণ করা যায় এবং প্রয়োজনে লেভোথাইরক্সিনের মাত্রা সমন্বয় করা যায়। এই পর্যবেক্ষণ খুবই গুরুত্বপূর্ণ, কারণ হরমোনের মাত্রা খুব বেশি বা খুব কম হয়ে গেলে তা শরীরের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
লেভোথাইরক্সিন ছাড়াও, কিছু ক্ষেত্রে রোগীদের কার্বিমাজল নামক একটি ওষুধ দিয়ে চিকিৎসা করা হয়। কার্বিমাজল মূলত থাইরয়েড হরমোনের অতিরিক্ত উৎপাদন বন্ধ করার জন্য ব্যবহৃত হয়, তবে হাইপোথাইরয়েডিজমের ক্ষেত্রে এটি ব্যবহৃত হয় শরীরের হরমোনের মাত্রা সঠিক রাখার জন্য। এই ওষুধটি সাধারণত একটানা এক থেকে দেড় বছর পর্যন্ত রোগীকে নিতে হয়, যাতে শরীরের হরমোনের উৎপাদন এবং কার্যক্ষমতা স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসে।
সবমিলিয়ে, হাইপোথাইরয়েডিজমের চিকিৎসায় প্রধানত হরমোন প্রতিস্থাপন থেরাপি ব্যবহৃত হয়, তবে রোগীর শারীরিক অবস্থার উপর নির্ভর করে অতিরিক্ত ওষুধ ও সাপ্লিমেন্টও দেওয়া হয়ে থাকে। চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে এবং নিয়মিত রক্ত পরীক্ষা করিয়ে এই রোগটি সঠিকভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।
হাইপোথাইরয়েডিজমের চিকিৎসা না করালে কি সমস্যা হতে পারে?
হাইপোথাইরয়েডিজমের চিকিৎসা না করালে শরীরের বিভিন্ন সিস্টেম এবং অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে নানা রকম গুরুতর সমস্যা দেখা দিতে পারে। থাইরয়েড হরমোন শরীরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করে, তাই এর অভাবে শরীরের কার্যক্ষমতা ব্যাপকভাবে ব্যাহত হয়। নিচে কিছু সম্ভাব্য জটিলতা উল্লেখ করা হলো, যা হাইপোথাইরয়েডিজমের চিকিৎসা না করালে হতে পারেঃ
১. মায়োক্সিডেমা কোমা
হাইপোথাইরয়েডিজমের সবচেয়ে গুরুতর এবং জীবন-সংকটাপন্ন জটিলতা হলো মায়োক্সিডেমা কোমা। এটি একটি বিরল কিন্তু গুরুতর অবস্থা, যেখানে রোগী চরম শারীরিক দুর্বলতা, হাইপোথার্মিয়া (শরীরের তাপমাত্রা বিপজ্জনকভাবে কমে যাওয়া), শ্বাস-প্রশ্বাসের সমস্যা, এবং অবশেষে কোমাতে চলে যেতে পারে। এটি একটি জরুরি চিকিৎসা পরিস্থিতি এবং সময়মতো চিকিৎসা না হলে মৃত্যু ঘটতে পারে।
২. হৃদরোগ
হাইপোথাইরয়েডিজমের কারণে রক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রা বেড়ে যেতে পারে, যা হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ায়। উচ্চ কোলেস্টেরল হৃদযন্ত্রের ধমনীতে চর্বি জমা করে, যা হার্ট অ্যাটাক এবং স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। এছাড়া, হৃদপিণ্ডের কার্যক্ষমতা কমে যাওয়া এবং হৃদস্পন্দন ধীর হয়ে যাওয়াও সম্ভব।
৩. মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা
হরমোনের অভাবের কারণে রোগীরা প্রায়ই বিষন্নতা, উদ্বেগ, এবং অন্যান্য মানসিক সমস্যা অনুভব করতে পারেন। দীর্ঘ সময় ধরে চিকিৎসা না করালে, এই মানসিক সমস্যা ক্রমশ তীব্র হতে পারে এবং দৈনন্দিন জীবনে গুরুতর প্রভাব ফেলতে পারে।
৪. প্রজনন সমস্যা
থাইরয়েড হরমোনের অভাব প্রজনন সিস্টেমে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলতে পারে। নারীদের ক্ষেত্রে মাসিক চক্র অনিয়মিত হতে পারে এবং বন্ধ্যাত্বের সমস্যা দেখা দিতে পারে। এছাড়াও, গর্ভধারণের সময় হাইপোথাইরয়েডিজম থাকলে গর্ভপাত, প্রি-একলামসিয়া, এবং শিশুদের মধ্যে জন্মগত ত্রুটির ঝুঁকি বাড়তে পারে।
৫. শিশুদের বিকাশে সমস্যা
শিশুদের ক্ষেত্রে হাইপোথাইরয়েডিজমের চিকিৎসা না হলে শারীরিক এবং মানসিক বিকাশে সমস্যা দেখা দিতে পারে। এটি শিশুদের বৃদ্ধি কমিয়ে দিতে পারে এবং মানসিক বিকাশে বাধা সৃষ্টি করতে পারে, যার ফলে শেখার ক্ষমতা, স্মৃতিশক্তি, এবং অন্যান্য মানসিক কার্যক্রমে সমস্যা হতে পারে।
৬. নার্ভাস সিস্টেমের জটিলতা
দীর্ঘ সময় ধরে হরমোনের অভাব থাকলে নার্ভাস সিস্টেমের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। এর ফলে স্নায়বিক দুর্বলতা, অবশ অনুভূতি, এবং শরীরের বিভিন্ন অঙ্গে সঠিকভাবে কাজ করতে না পারার সমস্যা দেখা দিতে পারে।
৭. গলায় গলফ্রেন বা গয়টার
থাইরয়েড হরমোনের অভাবে থাইরয়েড গ্রন্থিটি ফুলে যেতে পারে, যা গলায় গলফ্রেন বা গয়টার তৈরি করতে পারে। এটি গলায় চাপ অনুভূতি, শ্বাসকষ্ট, এবং গিলতে অসুবিধার কারণ হতে পারে।
হাইপোথাইরয়েডিজমের এসব জটিলতা এড়াতে রোগটি দ্রুত শনাক্ত করা এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী যথাযথ চিকিৎসা গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি। চিকিৎসা না করালে রোগটি ক্রমশ খারাপের দিকে যেতে পারে এবং জীবন-সংকটাপন্ন জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে।
হাইপোথাইরয়েডিজমের চিকিৎসা এবং নিয়ন্ত্রণে সঠিক খাদ্যাভ্যাস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এই রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের জন্য কিছু খাবার উপকারী হতে পারে, যা হরমোনের ভারসাম্য বজায় রাখতে এবং শরীরের স্বাভাবিক কার্যক্রমকে সহায়তা করতে পারে। অন্যদিকে, কিছু খাবার হরমোনের কার্যক্রমে বাধা সৃষ্টি করতে পারে, তাই সেগুলো এড়িয়ে চলা উচিত। নিচে হাইপোথাইরয়েডিজমে উপকারী এবং ক্ষতিকর উভয় ধরনের খাবার এবং অন্যান্য পরামর্শ দেওয়া হলোঃ
হাইপোথাইরয়েডিজমে উপকারী খাবার
১. ফাইবার বা আঁশযুক্ত খাবার
ফাইবার বা আঁশযুক্ত খাবার শরীরে বিপাকক্রিয়া বৃদ্ধিতে সহায়তা করে এবং কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যা কমায়, যা হাইপোথাইরয়েডিজমে প্রায়ই দেখা যায়। লাল চালে্য ভাত, লাল আটার রুটি, তিল, এবং ডাল এই ধরনের খাদ্যাভ্যাসের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হতে পারে। এছাড়া, এই ধরনের খাবার রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে সহায়ক, যা হরমোনের কার্যক্রমকে প্রভাবিত করে না।
২. সেলেনিয়াম যুক্ত খাবার
সেলেনিয়াম একটি গুরুত্বপূর্ণ খনিজ, যা থাইরয়েড হরমোনকে সক্রিয় রাখতে সহায়তা করে। সেলেনিয়ামের অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ক্ষমতা হরমোনের কার্যক্রম সঠিকভাবে বজায় রাখতে সহায়তা করে। ব্রাজিল বাদাম, টুনা মাছ, এবং ডিম সেলেনিয়ামের চমৎকার উৎস, যা নিয়মিত খাদ্য তালিকায় রাখা উচিত।
৩. জিংক যুক্ত খাবার
জিংক হরমোনের কার্যক্রমে সহায়ক এবং এর অভাবে থাইরয়েডের কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হতে পারে। চিংড়ি, গরুর মাংস, মুরগির মাংস, কাঁকড়া, এবং ঝিনুক জিংকের ভালো উৎস। এই ধরনের খাবার খাদ্য তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা থাইরয়েডের কার্যক্ষমতা বজায় রাখতে সাহায্য করতে পারে।
হাইপোথাইরয়েডিজমে এড়িয়ে চলার খাবার:
১. কিছু সবজি
কিছু সবজিতে এমন কিছু যৌগ থাকে, যা থাইরয়েড হরমোনের উৎপাদন বাধাগ্রস্ত করতে পারে। ব্রোকলি, বাঁধাকপি, ফুলকপি, বেগুন, শালগম, মিষ্টি আলু, এবং পালং শাক এই ধরনের সবজির মধ্যে অন্তর্ভুক্ত। এই সবজিগুলি এড়িয়ে চলা উচিত অথবা খুব সীমিত পরিমাণে খাওয়া উচিত।
২. আর্টিফিসিয়াল স্যুইটনার, মেয়োনিজ, সয়া জাতীয় খাবার
আর্টিফিসিয়াল স্যুইটনার এবং মেয়োনিজ থাইরয়েডের কার্যক্রমে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। এছাড়াও, সয়া জাতীয় খাবারে থাকা যৌগগুলো থাইরয়েড হরমোনের কার্যক্রমকে বাধা দিতে পারে, তাই এগুলো খাদ্য তালিকা থেকে বাদ দেওয়া উচিত।
৩. ফলমূল
স্ট্রবেরি, আঙুর, পিচ ফল, নাশপাতি, এবং চিনা বাদাম এই ধরনের ফলমূলে থাইরয়েড হরমোনের কার্যক্রমে বাধা সৃষ্টি করতে পারে। এই ধরনের ফলমূল খাদ্য তালিকায় সীমিত পরিমাণে রাখা উচিত বা সম্পূর্ণরূপে এড়িয়ে চলা উচিত।
ওজন নিয়ন্ত্রণ এবং ব্যায়াম
হাইপোথাইরয়েডিজমে ওজন নিয়ন্ত্রণ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এই রোগের কারণে রোগীদের ওজন বৃদ্ধি পায়, যা অন্যান্য স্বাস্থ্য জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে। তাই নিয়মিত হাঁটাহাঁটি করা বা হালকা ব্যায়াম করা ওজন নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হতে পারে। প্রতিদিনের নির্দিষ্ট সময়ে হালকা ব্যায়াম করা শরীরকে সক্রিয় রাখে এবং মেটাবোলিজম বৃদ্ধিতে সাহায্য করে, যা ওজন কমাতে সহায়ক।
সচেতন থাকুন
হাইপোথাইরয়েডিজম একটি উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ রোগ, যা যথাযথ চিকিৎসা না হলে গুরুতর জটিলতার কারণ হতে পারে। এই রোগের ফলে দীর্ঘমেয়াদী কোমা বা এমনকি মৃত্যুর ঝুঁকিও থাকতে পারে। নিয়মিত রক্ত পরীক্ষা এবং খাদ্যাভ্যাসের প্রতি সচেতন থাকা হাইপোথাইরয়েডিজম নিয়ন্ত্রণে রাখতে সহায়ক। তাই, সচেতন থাকুন এবং কোন লক্ষণ দেখা দিলে সাথে সাথে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।